ক্যানসার জয়ে যা প্রয়োজন

../news_img/195815_191.jpg

মৃদুভাষণ ডেস্ক ::মিসেস এফ, বয়স-৪০, স্তন ক্যানসার নিয়ে ২০১২ সালে এসেছিলেন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার জন্য। বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক ক্যানসার সোসাইটির তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিয়ে তিনি এখন সুস্থ জীবনযাপন করছেন। বিশ্ব ক্যানসার দিবসের ক্যানসার সারভাইভারস সম্মিলন অনুষ্ঠানে তার অনুভূতি ছিল, ‘আমি ভালো আছি।’ হোমিওপ্যাথিক ক্যানসার সোসাইটির এ অনুষ্ঠানে ৬০ জন সারভাইভারস অংশ নিয়েছিলেন। দুই-পাঁচ বছর পর্যন্ত যারা চিকিৎসায় ভালো আছেন, তাদের নিয়ে ছিল এ অনুষ্ঠান। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসের ৪ তারিখ বিশ্ব ক্যানসার দিবস পালন করা হয়। ক্যানসার প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি করাই এ দিবসের তাৎপর্য। বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক ক্যানসার সোসাইটি এ বছর ক্যানসার দিবসে ১০ শয্যার হাসপাতাল প্রকল্প চালু করেছে, যাতে দূর-দূরান্তের রোগীরা থাকার সুযোগ পায়। অধিকন্তু রোগীর নিবিড় পর্যবেক্ষণেও এ প্রকল্প কাজ করবে। বিশ্বে এই প্রথম হোমিওপ্যাথিক ক্যানসার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। সরকারের একজন সাবেক অতিরিক্ত সচিব এ প্রকল্পের দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকল্পের আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার সাদিয়া আরমান জানালেন, হোমিওপ্যাথিক ক্যানসার হাসপাতাল প্রকল্পটি একটি অভিনব কর্মসূচি। সাধারণ মানুষ এর দ্বারা বেশি উপকৃত হবে। স্বল্প খরচের এ চিকিৎসা প্রকল্পে সবারই এগিয়ে আসা উচিত।

প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

বাংলাদেশে ক্যানসার রোগীর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে এক হিসাব মতে, ক্যানসার রোগীর সংখ্যা প্রায় ২১ লাখ, এর সাথে প্রতি বছর দুই লাখ নতুন রোগী যোগ হচ্ছে। মারা যাচ্ছে প্রতি বছর দেড় লাখ ক্যানসার রোগী (বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটি সূত্রে প্রাপ্ত)। অন্য এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, বাংলাদেশে পুরুষদের মধ্যে ফুসফুস ক্যানসার (২৪.৭%) বেশি। মহিলাদের মধ্যে জরায়ুমুখ ক্যানসার (২৪.৬%) বেশি। মহিলাদের জরায়ুমুখ ক্যানসারের পরের অবস্থানে রয়েছে স্তন ক্যানসার (২৪.৩%)। তবে যেসব কারণে বাংলাদেশে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে, ধূমপান এবং তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সিগারেট বা তামাকে চার হাজার রাসায়নিক দ্রব্য রয়েছে। তার মধ্যে ৪৩টিই ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে। ধূমপান শুধু ধূমপানকারীর শরীরেই ক্যানসার সৃষ্টি করে না, পরোক্ষভাবে ধূমপায়ীর আশপাশের লোকদের মধ্যেও ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে। আমাদের দেশে প্রকাশ্যে ধূমপানে জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে তা তেমন কার্যকরি নয়। এ আইনটি কঠোরভাবে কার্যকরা করা প্রয়োজন।

ক্যানসার প্রতিরোধে শিক্ষা

ক্যানসার প্রতিরোধের মূল এজেন্ডা জনসচেতনতা। প্রচার মাধ্যম, সামাজিক সংগঠন, সরকারি বেসরকারি সংস্থা, এনজিও, সমাজকর্মী, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রভৃতি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষভাবে ধূমপান প্রতিরোধে তারা জোরালো ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেন। জরায়ুমুখ ক্যানসার এবং স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে সামাজিক সংস্থাগুলোর জনশক্তিকে পরিকল্পনানুযায়ী প্রশিক্ষণ দিলে তারা এতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবেন। যেমন- জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে বাল্যবিয়ে এবং যৌনাচারের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। স্তন ক্যানসার প্রতিরোধে নিজেই নিজের স্তন পরীক্ষার বিষয়টি বিভিন্ন স্তরের মহিলাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচার এবং প্রশিক্ষণ দেয়া।

ক্যানসার মুক্ত জীবনের জন্য যা প্রয়োজন

ক্যানসারের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পুরোপুরি জানা সম্ভব হয়নি। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, ক্যানসারের সাথে জীবনযাত্রার যোগসূত্র রয়েছে। আপনার খাবার, পানীয়, বায়ু গ্রহণ এবং ধূমপানের মতো অভ্যাসের সাথে রয়েছে ক্যানসারের নিবির সম্পর্ক এবং আপনার প্রতিদিনের জীবনযাত্রার পরিকল্পনাই আপনাকে কপ্রণসারমুক্ত জীবনের সুসংবাদ দিতে পারে, যদি আপনি আপনার জীবনকে ঢেলে সাজাতে পারেন এভাবে :

০১. অধিক হারে টাটকা শাকসবজি খাওয়ার অভ্যাস করুন : বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গেছে সবুজ, হলুদ এবং পাতাজাতীয় শাকসবজি অন্ত্র, পায়ুপথ, প্রোস্টেট, পাকস্থলি, শ্বাসযন্ত্র, স্তন এবং জরায়ুরমুখের ক্যানসার প্রতিরোধ করতে পারে। এ জন্য বাঁধাকপি ও ফুলকপি বেশি উপকারী।
০২. অধিক আঁশজাতীয় খাবার গ্রহণ করুন : অধিক আঁশজাতীয় খাবার অন্ত্র পায়ুপথ ক্যানসার প্রতিরোধ করে। এ জন্য লাল আটা, গম, চাল, শস্যদানা, ভুট্টা, গোলআলু, মটরশুঁটি, কিশমিশ, আপেল, কমলা, টম্যাটো ইত্যাদি জাতীয় খাবার অধিক গ্রহণে কগ্রণসার প্রতিরোধ হতে পারে।
০৩. ভিটামিন ‘এ’ জাতীয় খাবার বেশি গ্রহণ করুন : মুখ, অন্ননালী, শ্বাসনালী, পাকস্থলি, অন্ত্র, পায়ুপথ, প্রস্রাবথলি এবং জরায়ুর মুখের কপ্রণসার প্রতিরোধ করতে পারে ভিটামিন ‘এ’ জাতীয় খাবার, যেমন : ডিমের কুসুম, দুগ্ধজাতীয় খাবার, মাছ, কলিজা, টাটকা ফলফলাদি এবং সবুজ শাকসবজিতে প্রচুর ভিটামিন ‘এ’ পাওয়া যায়। মনে রাখবেন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ার চেয়ে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ অধিক উত্তম।
০৪. ভিটামিন সি জাতীয় খাবার অধিক গ্রহণ করুন : ভিটামিন সি যেসব অঙ্গের ক্যানসার প্রতিরোধ করতে পারে তার মধ্যে রয়েছে মুখ, অন্ননালী, অন্ত্র, পাকস্থলি পায়ুপথ এবং জরায়ুর মুখ। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবারের মধ্যে রয়েছে আমলকী, আমড়া, আম, পেয়ারা, ফুলকপি, কমলা, লেবু, কাঁচামরিচ, পেঁপে, টম্যাটো ইত্যাদি।
০৫. শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ করুন : মোটা মানুষের অন্ত্র, জরায়ু, পিত্তথলি এবং স্তনের ক্যানসার হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। এ জন্য নিয়মিত ব্যায়াম (হাঁটার অভ্যাস বেশ উপকারী) এবং অধিক ক্যালরিযুক্ত খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন।

প্রতিদিনের জীবন থেকে পরিহার করুন : ০১. উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন। চর্বিযুক্ত খাবার স্তন, অন্ত্র এবং প্রোস্টেটের ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে। এ ছাড়া চিনি ও মিষ্টি জাতীয় খাবার পরিহার করুন।

০২. ধূমপান থেকে বিরত থাকুন : ধূমপানে সর্বাধিক ক্যানসার সৃষ্টি হয়। ফুসফুস এবং মূত্রথলির ক্যানসারের প্রধান কারণ ধূমপান।
০৩. পান, জর্দা, তামাক সেবন বন্ধ করুন : মুখ মাড়ি এবং গলনালী ক্যানসার প্রতিরোধে পান, জর্দা, তামাক সেবন বন্ধ করুন।
০৪. মদ পানে বিরত থাকুন : লিভার ক্যানসার এবং সিরোসিসের প্রতিরোধে অবশ্যই মদপান থেকে বিরত থাকুন।
০৫. আচার, কাসন্দ, শুঁটকি এবং লবণ দেয়া মাছ গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন : কারণ এর দ্বারা অন্ননালী এবং পাকস্থলির কগ্রণসার সৃষ্টি হতে পারে।

ক্যানসারের ৭টি সতর্ক লক্ষণ :

০১. পায়খানা প্রস্রাবের অভ্যাসের পরিবর্তন
০২. কোনো ক্ষত না শুকানোর প্রবণতা।
০৩. অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ।
০৪. স্তনে কোনো শক্ত দলা অথবা শরীরের অন্য কোনো জায়গায় শক্ত পিণ্ড বর্তমান থাকা।
০৫. পেটের অজীর্ণতা কিংবা ঢোক গিলতে অসুবিধা।
০৬. আঁচিল বা তিলের অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন।
০৭. বিরক্তিকর অবিরত কাশি কিংবা গলা বসে যাওয়ার প্রবণতা।

নিয়মিত মেডিক্যাল চেকআপ করুন : ক্যানসার নির্ণয়ে নিয়মিত মেডিক্যাল চেকআপ জরুরি। বছরে অন্তত একবার মেডিক্যাল চেকআপ হওয়া আবশ্যক। কোনো কারণে ক্যানসার বিষয়ে প্রশ্ন দেখা দিলে কাছের কোনো ক্যানসার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করুন।

ধূমপান এবং তামাকজাত দ্রব্য নিষিদ্ধ : ক্যানসার রোগকে এখন মানব সৃষ্ট রোগ বলে আখ্যায়িত করা হয়। অস্বস্তিকর খাবার দাবার ৩৫ শতাংশ ক্যানসারের জন্য দায়ী। এর পরেই ধূমপানজনিত ক্যানসার ৩০ শতাংশ। ধূমপানের বাইরে সাদা পাতা, জর্দা, গুঠকা, গুল সেবন ইত্যাদি তামাকজাত দ্রব্র্যও ধূমপানের সমতুল্য কারণ। চিকিৎসা বিজ্ঞানে যেমন তামাকজাত দ্রব্য সেবন নিষিদ্ধ, তেমনি ইসলামেও তামাকজাত দ্রব্য সেবন নিষিদ্ধ। সামাজিকভাবে ধূমপান এবং তামাকজাত দ্রব্য সেবনের বিরুদ্ধে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন। গ্রামবাংলায় বিয়ে-শাদি থেকে শুরু করে নানা সামাজিক কর্মসূচিতে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের যে কুসংস্কার প্রচলিত তার বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন। রাজনৈতিক ব্যক্তি, সামাজিক ব্যক্তি, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। যেমন একজন ইউনিয়ন চেয়ারম্যান যদি নিজে ধূমপান কিংবা তামাকজাত দ্রব্য সেবন না করেন কিংবা অন্যদের নিষেধ করেন, অথবা ইউনিয়নের সামাজিক কর্মসূচিতে ধূমপান বন্ধ রাখেন তাহলে সাধারণ জনগণ সতর্ক হয়ে যাবেন। ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব কিংবা মসজিদের ইমাম-মোয়াজ্জিন যদি জর্দা, সাদা পাতার বিরুদ্ধে মুসল্লিদের সচেতন করেন, তাহলে অধিকাংশ জনগণই তা বর্জন করবেন। অভিযোগ রয়েছে যে, অনেক ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব জর্দা সাদা পাতা গুল সেবনে অভ্যস্ত। অথচ ইসলামী বিধানে তা নিষিদ্ধ। জ্ঞানের স্বল্পতার কারণেই অনেকে এ ধরনের কুঅভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে যান।

প্রয়োজন সমন্বিত প্রচেষ্টা : ক্যানসার প্রতিরোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। চিকিৎসা ক্ষেত্রেও প্রয়োজন সমন্বিত প্রচেষ্টা। আমাদের মনে রাখা দরকার যে, কোনো চিকিৎসা পদ্ধতিই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। অ্যালোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, ইউনানী, আয়ুর্বেদি, হারবাল ইত্যাদি প্রত্যেক চিকিৎসাপদ্ধতিরই কার্যকর গুণাবলি যেমন রয়েছে, তেমনি তাদের অনেক ব্যর্থতাও রয়েছে। আমাদের বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে কুসংস্কারের কোনো জায়গা নেই। তেমনি অহমিকারও কোনো মর্যাদা নেই। গবেষণায় যদি কোনো চিকিৎসাপদ্ধতি তার সক্ষমতা প্রমাণে সক্ষম হয়, তাহলে জনগণের স্বার্থে তা প্রচার ও প্রয়োগে সবাইকে এগিয়ে আসা উচিত।